সহজ উপায়ে চিকেন বিরিয়ানি রেসিপি
সহজ উপায়ে চিকেন বিরিয়ানি রেসিপি
বিরিয়ানি, নামটি শুনলেই জিভে জল আসে না এমন ভোজন রসিক খুঁজে পাওয়া কঠিন। এটি কেবল একটি খাবার নয়, এটি একটি সংস্কৃতি, একটি উৎসব, একটি ভালোবাসার প্রতীক। ভারত, বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিরিয়ানি অত্যন্ত জনপ্রিয়। আর আজ আমরা আলোচনা করব কীভাবে খুব সহজ উপায়ে ঘরে বসেই রেস্টুরেন্টের মতো সুস্বাদু চিকেন বিরিয়ানি তৈরি করা যায়। এই রেসিপিটি আপনার রান্নার অভিজ্ঞতাকে আরও আনন্দদায়ক করে তুলবে এবং আপনার পরিবার ও বন্ধুদের মন জয় করবে।
বিরিয়ানির উৎপত্তি, ইতিহাস এবং জনপ্রিয়তা
বিরিয়ানির উৎস নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। অনেকেই মনে করেন, বিরিয়ানি পারস্য থেকে ভারতে এসেছে। ফারসি শব্দ 'বিরিঞ্জ বিরিয়ান' থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে, যার অর্থ 'রান্না করা চাল'। মোগল আমলে বিরিয়ানি ভারতে জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে এর নিজস্ব সংস্করণ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে এটি ভারতীয় উপমহাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি, লখনৌই বিরিয়ানি, কলকাতা বিরিয়ানি, ঢাকাই বিরিয়ানি সহ আরও অনেক বৈচিত্র্যপূর্ণ বিরিয়ানি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এর সুগন্ধ, মুখরোচক স্বাদ এবং সমৃদ্ধ ইতিহাসই এর জনপ্রিয়তার মূল কারণ।
কেন এই রেসিপিটি বেছে নেবেন?
এই রেসিপিটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে যারা চিকেন বিরিয়ানিকে জটিল মনে করেন তাদের জন্য। এখানে প্রতিটি ধাপ সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যাতে নতুনরাও অনায়াসে এটি তৈরি করতে পারেন। কম সময়ে, কম পরিশ্রমে এবং সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে কীভাবে রেস্টুরেন্টের স্বাদের বিরিয়ানি তৈরি করা যায়, তার একটি সম্পূর্ণ নির্দেশিকা এখানে দেওয়া হলো।
চিকেন বিরিয়ানি রান্নার সময়:
প্রস্তুতি সময়: ৩০-৪০ মিনিট
রান্নার সময়: ৪৫-৬০ মিনিট
মোট সময়: ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট - ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট
উপকরণ (৬-৮ জনের জন্য):
মাংস মেরিনেট করার জন্য:
মুরগির মাংস: ১ কেজি (মাঝারি টুকরো করে কাটা)
পেঁয়াজ বাটা: ২ টেবিল চামচ
আদা বাটা: ১ টেবিল চামচ
রসুন বাটা: ১ টেবিল চামচ
টক দই: ১/২ কাপ
লাল মরিচের গুঁড়ো: ১ চা চামচ
ধনে গুঁড়ো: ১ চা চামচ
হলুদ গুঁড়ো: ১/২ চা চামচ
জিরা গুঁড়ো: ১/২ চা চামচ
বিরিয়ানি মসলা: ২ টেবিল চামচ
লেবুর রস: ১ টেবিল চামচ
কাঁচামরিচ : ৪-৫টি
লবণ: স্বাদমতো
সরিষার তেল /সাদা তেল: ২ টেবিল চামচ
ভাতের জন্য:
বাসমতি চাল/পোলাওর চাল: ৫০০ গ্রাম (১ কেজি মাংসের জন্য)
তেজপাতা: ২-৩টি
এলাচ: ৪-৫টি
দারচিনি: ২ টুকরো
লবঙ্গ: ৪-৫টি
শাহী জিরা: ১/২ চা চামচ
লবণ: ২ চা চামচ (স্বাদমতো)
সাদা তেল/ঘি: ১ টেবিল চামচ
পুদিনা পাতা: সামান্য
অন্যান্য উপকরণ:
পেঁয়াজ কুচি: ২ কাপ (বেরেস্তার জন্য)
সাদা তেল: ১/২ কাপ (বেরেস্তা ভাজার জন্য)
আদা কুচি: ১ টেবিল চামচ
পুদিনা পাতা: ১/৪ কাপ
ধনে পাতা: ১/৪ কাপ
কেওড়া জল: ১ চা চামচ
গোলাপ জল: ১ চা চামচ
জাফরান ভেজানো দুধ: ২ টেবিল চামচ (২ টেবিল চামচ দুধে সামান্য জাফরান ভিজিয়ে রাখুন)
ঘি: ২ টেবিল চামচ
আলু: ২-৩টি (বড় টুকরো করে কাটা)
প্রস্তুত প্রণালী:
১: মাংস মেরিনেট করা
মুরগির মাংস ভালো করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন।
একটি বড় পাত্রে মাংস নিয়ে এর সাথে পেঁয়াজ বাটা, আদা বাটা, রসুন বাটা, টক দই, লাল মরিচের গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, হলুদ গুঁড়ো, জিরা গুঁড়ো, বিরিয়ানি মসলা, লেবুর রস, চেরা কাঁচামরিচ, লবণ এবং সরিষার তেল/সাদা তেল মিশিয়ে নিন।
সব উপকরণ মাংসের সাথে ভালোভাবে মেখে কমপক্ষে ১-২ ঘণ্টা ফ্রিজে রেখে দিন। (হাতে সময় থাকলে ৪-৫ ঘণ্টা বা সারারাত রাখলে মাংস আরও নরম ও সুস্বাদু হবে)।
২: বেরেস্তা তৈরি
একটি কড়াইতে তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভেজে বেরেস্তা তৈরি করে নিন।
বেরেস্তা তুলে কিচেন টিস্যুর উপর রাখুন যাতে অতিরিক্ত তেল শুষে নেয়। এই তেল বিরিয়ানির জন্য ব্যবহার করা যাবে।
যদি আলু ব্যবহার করতে চান, তাহলে এই তেলেই সামান্য লবণ ও হলুদ দিয়ে আলুগুলো হালকা সোনালি করে ভেজে তুলে নিন।
৩: চাল প্রস্তুত করা
চাল ভালো করে ধুয়ে অন্তত ৩০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।
একটি বড় পাত্রে প্রচুর পরিমাণে পানি ফুটিয়ে নিন। এতে তেজপাতা, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, শাহী জিরা এবং লবণ দিন।
ভিজিয়ে রাখা চাল পানি ঝরিয়ে ফুটন্ত পানিতে দিন।
চাল ৮০% সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। খেয়াল রাখবেন যেন চাল পুরোপুরি সেদ্ধ না হয়, কারণ এটি দমে আরও রান্না হবে। চালের একটি দানা টিপে দেখুন, যেন ভেতরে সামান্য শক্ত থাকে।
চাল সেদ্ধ হয়ে গেলে ফ্যান ঝরিয়ে ঠান্ডা পানির নিচে হালকা ধুয়ে নিন যাতে চালের দানাগুলো একে অপরের সাথে লেগে না যায়। চাল থেকে সম্পূর্ণ পানি ঝরিয়ে একটি বড় ছড়ানো থালায় রাখুন।
৪: মাংস রান্না করা
যে কড়াইতে বেরেস্তা ভাজা হয়েছিল, সেই কড়াইতে বা অন্য একটি বড় পাত্রে মেরিনেট করা মাংস ঢেলে দিন।
মাঝারি আঁচে মাংস রান্না করুন। মাংস থেকে যে পানি বের হবে, তাতেই এটি সেদ্ধ হবে। যদি প্রয়োজন হয়, সামান্য গরম পানি যোগ করতে পারেন।
মাংস আধা সেদ্ধ হলে ভেজে রাখা আলু (যদি ব্যবহার করেন) যোগ করুন।
মাংস এবং আলু পুরোপুরি সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন এবং ঝোল ঘন হয়ে এলে নামিয়ে রাখুন। খেয়াল রাখবেন যেন মাংসের নিচে সামান্য মসলা লেগে থাকে।
৫: দমে বসানো (লেয়ারিং)
একটি মোটা তলার বড় হাঁড়ি বা সসপ্যান নিন।
প্রথমে হাঁড়ির নিচে এক টেবিল চামচ ঘি ছড়িয়ে দিন যাতে ভাত লেগে না যায়।
এবার রান্না করা মাংসের মিশ্রণের অর্ধেকটা হাঁড়ির নিচে বিছিয়ে দিন।
এর উপর সেদ্ধ ভাতের অর্ধেকটা সমানভাবে ছড়িয়ে দিন।
ভাতের উপর অর্ধেকটা বেরেস্তা, সামান্য ধনে পাতা, পুদিনা পাতা, আদা কুচি, ১ টেবিল চামচ ঘি, অর্ধেকটা কেওড়া জল, গোলাপ জল এবং জাফরান ভেজানো দুধ ছড়িয়ে দিন।
এবার বাকি মাংসের মিশ্রণটি ভাতের উপর দিন।
সবশেষে বাকি ভাত, বেরেস্তা, ধনে পাতা, পুদিনা পাতা, আদা কুচি, বাকি ঘি, কেওড়া জল, গোলাপ জল এবং জাফরান ভেজানো দুধ দিয়ে আরেকটি স্তর তৈরি করুন।
৬: দমে রাখা
হাঁড়ির মুখ একটি ঢাকনা দিয়ে ভালো করে বন্ধ করুন। চাইলে আটা বা ময়দা দিয়ে ঢাকনার চারপাশ সিল করে দিতে পারেন যাতে ভেতরের বাষ্প বাইরে বেরোতে না পারে।
হাঁড়িটি প্রথমে মাঝারি আঁচে ৫-৭ মিনিট রাখুন, তারপর একদম কম আঁচে ২০-২৫ মিনিট দমে রাখুন।
যদি আপনার হাঁড়ির তলা পাতলা হয়, তবে একটি তাওয়ার উপর হাঁড়ি বসিয়ে দমে রাখুন যাতে বিরিয়ানি নিচে লেগে না যায়।
পরিবেশন:
দম থেকে নামানোর পর, একটি বড় চামচ বা খুন্তি দিয়ে বিরিয়ানি আলতো করে মিশিয়ে নিন। খেয়াল রাখবেন যেন চালের দানা ভেঙে না যায়। গরম গরম চিকেন বিরিয়ানি সালাদ, রায়তা অথবা বোরহানির সাথে পরিবেশন করুন।
পুষ্টিগুণ:
চিকেন বিরিয়ানি একটি সুষম খাবার। এতে প্রোটিন (মাংস), কার্বোহাইড্রেট (চাল), ফ্যাট এবং বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ (মসলা ও শাক-সবজি) বিদ্যমান। তবে অতিরিক্ত তেল ও মসলা ব্যবহার করলে এর ক্যালরি বেড়ে যেতে পারে। তাই পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস:
ভালো মানের চাল: বিরিয়ানির আসল স্বাদ পেতে ভালো মানের বাসমতি চাল বা সুগন্ধি পোলাওর চাল ব্যবহার করুন।
চাল ভেজানো: চাল ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখলে রান্না করার সময় চালের দানা লম্বা এবং ঝরঝরে হয়।
হালকা হাতে মেশানো: দমে রাখার পর বিরিয়ানি মেশানোর সময় আলতো হাতে মেশান, এতে চাল ভাঙবে না।
দমের গুরুত্ব: বিরিয়ানি দমে রাখাই এর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। সঠিক দমে বিরিয়ানির প্রতিটি চালের দানায় মসলার গন্ধ ও স্বাদ মিশে যায়।
বেরেস্তা: ঘরে তৈরি টাটকা বেরেস্তা বিরিয়ানির স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
জাফরান: সামান্য জাফরান ব্যবহার করলে বিরিয়ানিতে সুন্দর রঙ ও সুগন্ধ আসে।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর:
প্রশ্ন: বিরিয়ানিতে চাল কেন ৮০% সেদ্ধ করা হয়?
উত্তর: কারণ বিরিয়ানি দমে রাখার সময় বাকি ২০% সেদ্ধ হয়ে যায়। এতে চাল ঝরঝরে থাকে এবং বেশি নরম হয়ে যায় না।
প্রশ্ন: বিরিয়ানি মসলা ঘরে তৈরি করা কি সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব। এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, শাহী জিরা, জায়ফল, জয়ত্রী, শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা ইত্যাদি ভেজে গুঁড়ো করে ঘরেই বিরিয়ানি মসলা তৈরি করা যায়।
প্রশ্ন: চিকেন বিরিয়ানি কতদিন ফ্রিজে রাখা যায়?
উত্তর: রান্না করা চিকেন বিরিয়ানি এয়ারটাইট কন্টেইনারে ফ্রিজে ৩-৪ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। তবে তাজা বিরিয়ানিই সবচেয়ে সুস্বাদু।
প্রশ্ন: দমে রাখার সময় বিরিয়ানির নিচে লেগে গেলে কী করব?
উত্তর: দমে রাখার সময় নিচে একটি তাওয়া ব্যবহার করুন এবং একদম কম আঁচে রাখুন। এতে বিরিয়ানি নিচে লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
প্রশ্ন: বিরিয়ানিতে আলু ব্যবহার করা কি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: না, এটি সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। অনেকে আলুর স্বাদ পছন্দ করেন না, আবার অনেকে মনে করেন আলু ছাড়া বিরিয়ানি অসম্পূর্ণ। আপনার পছন্দ অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারেন।
এই রেসিপিটি অনুসরণ করে আপনিও ঘরে বসেই তৈরি করতে পারবেন অসাধারণ স্বাদের চিকেন বিরিয়ানি। একবার চেষ্টা করে দেখুন, এর মন মুগ্ধ করা স্বাদ আপনাকে মুগ্ধ করবে।
