পুরান ঢাকার চিকেন তেহারি
পুরান ঢাকার চিকেন তেহারি
তেহারি। নামটি শুনলেই জিভে জল চলে আসে, বিশেষ করে যদি সেটা হয় পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চিকেন তেহারি। এক প্লেট সুগন্ধি, হালকা মশলাদার আর মুখে লেগে থাকার মতো স্বাদের এই খাবারটি শুধু ভোজনরসিকদের কাছে নয়, আপামর বাঙালির কাছেই এক ভালোবাসার নাম। কিন্তু কী এই তেহারি? এর উৎপত্তি কোথায়? কীভাবে এই খাবারটি বাঙালির পাতে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠলো? চলুন, জেনে নেওয়া যাক পুরান ঢাকার চিকেন তেহারির আদ্যোপান্ত।
উৎপত্তি ও ইতিহাস
তেহারি শব্দটি এসেছে ফার্সি শব্দ 'তেহ-আহারি' বা 'তাহারি' থেকে, যার অর্থ 'নিচের খাবার' বা 'উপরে সাজানো খাবার'। ধারণা করা হয়, এর উৎপত্তি মুঘল আমলে। সে সময় মুঘল হেঁশেলে নানান ধরনের সুস্বাদু খাবারের প্রচলন ছিল, যার মধ্যে তেহারি ছিল অন্যতম। তবে আজকের যে তেহারি, তার সাথে মুঘল তেহারির কিছুটা পার্থক্য আছে।
ঐতিহাসিকভাবে, তেহারি ছিল মুঘল সৈন্যদের জন্য তৈরি একটি সহজ কিন্তু পুষ্টিকর খাবার। মূলত চাল এবং মাংস দিয়ে তৈরি এই খাবারটি দ্রুত রান্না করা যেত এবং সৈন্যদের শক্তি যোগাতো। পরবর্তীতে, এই খাবারটি সাধারণ মানুষের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং সময়ের সাথে সাথে এর রেসিপিতে আসে নানান পরিবর্তন।
পুরান ঢাকায় তেহারির আগমন ঘটে মূলত অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতাব্দীতে। এখানকার নবাবী সংস্কৃতির প্রভাবে তেহারি এক নতুন রূপ লাভ করে। পুরান ঢাকার বাবুর্চিরা তাদের নিজস্ব রন্ধনশৈলী আর বিশেষ মশলার মিশেলে এই খাবারটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। এর বিশেষত্ব হলো, এতে মাংসের টুকরোগুলি ছোট ছোট করে কাটা হয় এবং মাংস ও ভাতের অনুপাত এমন থাকে যেন প্রতিটি গ্রাসে মাংসের স্বাদ পাওয়া যায়। এটি পোলাওর মতো সমৃদ্ধ না হলেও, এর নিজস্ব একটি আবেদন রয়েছে যা এটিকে ভোজনরসিকদের কাছে এত প্রিয় করে তুলেছে।
জনপ্রিয়তা
পুরান ঢাকার চিকেন তেহারির জনপ্রিয়তার মূল কারণ হলো এর অসাধারণ স্বাদ এবং স্বতন্ত্রতা। এখানকার তেহারির রং সাধারণত হালকা বাদামী হয় এবং এতে ব্যবহৃত হয় এক বিশেষ ধরনের মশলার মিশ্রণ। এতে পেঁয়াজ, আদা, রসুন, কাঁচালঙ্কা, গরম মশলা, টক দই এবং সরিষার তেল (যা এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য) ব্যবহার করা হয়। সরিষার তেলের ব্যবহার তেহারিকে একটি বিশেষ ঘ্রাণ ও স্বাদ প্রদান করে যা অন্য কোনো তেহারিতে পাওয়া যায় না। এছাড়াও, ছোট ছোট মাংসের টুকরো এবং ঝরঝরে সুগন্ধি চাল এর স্বাদকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বিয়ে, মেজবান, বা যেকোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে তেহারি ছাড়া যেন চলেই না।
রান্নার সময়:
প্রস্তুত করতে: ৩০ মিনিট
রান্নার সময়: ৫০-৬০ মিনিট
মোট সময়: প্রায় ১.৫ ঘণ্টা
উপকরণ:
চিকেন (হাড় সহ ছোট টুকরা করা): ৫০০ গ্রাম
বাসমতী চাল/পোলাও চাল: ৫০০ গ্রাম (ভালোভাবে ধুয়ে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে পানি ঝরানো)
পেঁয়াজ কুচি: ১ কাপ
আদা বাটা: ২ টেবিল চামচ
রসুন বাটা: ১.৫ টেবিল চামচ
কাঁচামরিচ বাটা /ছেঁচে নেওয়া: ১.৫ টেবিল চামচ (স্বাদমতো কমবেশি করা যাবে)
টক দই: আধা কাপ
সরিষার তেল: ১/২ কাপ (এর আসল স্বাদ আনতে এটি অপরিহার্য)
গোটা গরম মশলা:
দারুচিনি: ৩-৪ টুকরা (১ ইঞ্চি)
এলাচ: ৪-৫টি
লবঙ্গ: ৫-৬টি
তেজপাতা: ২-৩টি
গুঁড়ো মশলা:
ধনে গুঁড়ো: ১ চা চামচ
জিরা গুঁড়ো: ১ চা চামচ
লাল মরিচের গুঁড়ো : ১ চা চামচ
গরম মশলা গুঁড়ো: ১/২ চা চামচ
আলু বোখারা: ৫-৬টি
লবণ: স্বাদমতো
পানি/চিকেন স্টক: চালের দ্বিগুণ পরিমাণ (যেমন ৫০০ গ্রাম চালে ১ লিটার পানি)
কেওড়া জল: ১ চা চামচ
পেঁয়াজ বেরেস্তা: ২ টেবিল চামচ
ধনে পাতা কুচি: ২ টেবিল চামচ
প্রস্তুত প্রণালী:
১. একটি বড় বাটিতে চিকেন নিন। এর সাথে আদা বাটা (১ টেবিল চামচ), রসুন বাটা (১ টেবিল চামচ), টক দই, ধনে গুঁড়ো, জিরা গুঁড়ো, লাল মরিচের গুঁড়ো, গরম মশলা গুঁড়ো এবং ১ চা চামচ লবণ দিয়ে ভালোভাবে মেখে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা ম্যারিনেট করে রাখুন।
২. একটি বড় সসপ্যান বা হাঁড়িতে সরিষার তেল গরম করুন। তেল গরম হলে এতে তেজপাতা, দারুচিনি, এলাচ ও লবঙ্গ দিয়ে হালকা ভেজে নিন। সুন্দর গন্ধ বের হলে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।
৩. ভাজা পেঁয়াজের মধ্যে বাকি আদা বাটা, রসুন বাটা ও কাঁচামরিচ বাটা দিয়ে ভালো করে কষিয়ে নিন যতক্ষণ না মশলার কাঁচা গন্ধ চলে যায়।
৪. এবার ম্যারিনেট করা চিকেন দিয়ে মাঝারি আঁচে কষাতে থাকুন। চিকেন থেকে পানি ছাড়তে শুরু করবে। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রান্না করুন যতক্ষণ না মাংস নরম হয়ে আসে এবং তেল উপরে ভেসে ওঠে। মাঝে মাঝে নেড়ে দেবেন যেন নিচে লেগে না যায়। এই ধাপে আলুবোখারা দিয়ে দিন।
৫. মাংস কষানো হয়ে গেলে অন্য একটি কড়াইতে সামান্য সরিষার তেল দিয়ে ভেজানো ও পানি ঝরানো চাল হালকা ভেজে নিন। চাল যেন ঝরঝরে হয়। এই ধাপটি তেহারিকে ঝরঝরে বানাতে সাহায্য করে।
৬. কষানো মাংসের মধ্যে ভাজা চাল দিয়ে দিন। চাল ও মাংস একসাথে ৫-৭ মিনিট মাঝারি আঁচে ভাজুন। লবণ চেখে দেখুন এবং প্রয়োজন হলে যোগ করুন।
৭. এবার গরম পানি বা চিকেন স্টক দিন। পানি এমনভাবে দেবেন যেন চালের উপরে ১ ইঞ্চি মতো থাকে। কেওড়া জল দিয়ে আলতো করে নেড়ে মিশিয়ে নিন।
৮. ঢাকনা দিয়ে ঢেকে উচ্চ তাপে একটি বলক আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। বলক আসলে চুলার আঁচ একদম কমিয়ে দিন (দম দেওয়ার মতো)। হাঁড়ির নিচে একটি তাওয়া বা পুরোনো প্যান দিয়ে তার উপর হাঁড়ি বসিয়ে দিন যাতে নিচে লেগে না যায়। এভাবে ২০-২৫ মিনিট দমে রাখুন।
৯. ২০-২৫ মিনিট পর ঢাকনা খুলে দেখুন পানি শুকিয়ে গেছে কিনা। চাল সিদ্ধ হয়ে ঝরঝরে হয়ে গেলে চুলা বন্ধ করে দিন। আরো ১০ মিনিট ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখুন যাতে ভেতরের তাপেই তেহারি ভালোভাবে সেট হয়ে যায়।
পুষ্টিগুণ (আনুমানিক):
পুরান ঢাকার চিকেন তেহারিতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং চর্বির একটি ভালো মিশ্রণ থাকে।
কার্বোহাইড্রেট: প্রধানত চাল থেকে আসে, যা শক্তি যোগায়।
প্রোটিন: চিকেন থেকে পাওয়া যায়, যা পেশী গঠনে সাহায্য করে।
চর্বি: সরিষার তেল এবং মাংস থেকে আসে, যা কিছু ভিটামিন শোষণে সাহায্য করে।
ভিটামিন ও খনিজ: আদা, রসুন, পেঁয়াজ এবং অন্যান্য মশলা থেকে সীমিত পরিমাণে পাওয়া যায়।
তবে, এটি একটি ক্যালরি-ঘন খাবার। তাই পরিমাণ মতো খাওয়া উচিত।
কিছু টিপস:
সরিষার তেল: আসল পুরান ঢাকার তেহারির স্বাদ পেতে সরিষার তেল ব্যবহার অত্যাবশ্যক।
মাংসের টুকরা: ছোট ছোট টুকরোতে মাংস কাটলে মশলা ভালোভাবে প্রবেশ করে এবং প্রতি গ্রাসে মাংসের স্বাদ পাওয়া যায়।
চাল: বাসমতী বা কালিজিরা চাল ব্যবহার করুন। চাল ধোয়ার পর কমপক্ষে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে পানি ঝরিয়ে নিন, এতে চাল ঝরঝরে হবে।
দম: তেহারির আসল স্বাদ আসে দমে রাখার মাধ্যমে। তাই একদম কম আঁচে বা তাওয়ার উপরে রেখে দমে রাখুন।
লবণ: মাংস কষানোর সময় এবং চাল দেওয়ার পর দুইবার লবণ চেখে দেখুন।
পরিবেশন:
গরম গরম পুরান ঢাকার চিকেন তেহারি পরিবেশন করুন শসা, পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচের সালাদ অথবা বোরহানির সাথে। অনেকে এর সাথে ডিমের কোরমা বা শামী কাবাবও পছন্দ করেন। উপরে সামান্য বেরেস্তা ছিটিয়ে দিলে দেখতেও সুন্দর লাগে এবং স্বাদও বাড়ে।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: তেহারি কি বিরিয়ানির থেকে আলাদা?
উত্তর: হ্যাঁ, তেহারি বিরিয়ানি থেকে আলাদা। তেহারিতে মাংসের টুকরোগুলি ছোট হয় এবং এটি সাধারণত পোলাওর মতো সমৃদ্ধ হয় না। এর মশলার ব্যবহার এবং রান্নার প্রক্রিয়াও বিরিয়ানি থেকে কিছুটা ভিন্ন। তেহারিতে সরিষার তেলের ব্যবহার এটিকে একটি স্বতন্ত্র স্বাদ দেয়।
প্রশ্ন: সরিষার তেলের পরিবর্তে অন্য তেল ব্যবহার করা যাবে?
উত্তর: স্বাদ ও সুগন্ধের জন্য সরিষার তেলই আদর্শ। তবে, যদি কেউ সরিষার তেলের গন্ধ পছন্দ না করেন, তাহলে সাধারণ সয়াবিন তেল ব্যবহার করতে পারেন, তবে এতে আসল পুরান ঢাকার তেহারির স্বাদ কিছুটা ভিন্ন হবে।
প্রশ্ন: তেহারিতে কি সবজি যোগ করা যায়?
উত্তর: ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার তেহারিতে সাধারণত কোনো সবজি যোগ করা হয় না। তবে, কেউ চাইলে ছোট করে কাটা আলু বা মটরশুঁটি যোগ করতে পারেন, যা এর স্বাদ কিছুটা পরিবর্তন করবে।
প্রশ্ন: কীভাবে বুঝবো তেহারি দমে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত?
উত্তর: যখন চালের পানি প্রায় শুকিয়ে আসবে এবং চালগুলো চালগুলো ওপরের দিকে উঠে আসবে ও ছোট ছোট গর্ত দেখা যাবে, তখন বুঝতে হবে তেহারি দমে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।
প্রশ্ন: বাসমতী চালের পরিবর্তে সাধারণ চাল ব্যবহার করা যাবে?
উত্তর: কালিজিরা চাল বা চিনিগুঁড়া চাল ব্যবহার করা যেতে পারে, যা সুগন্ধি হয়। তবে সাধারণ মোটা চাল ব্যবহার করলে তেহারি ঝরঝরে নাও হতে পারে এবং স্বাদও ভিন্ন হতে পারে।
উপসংহার:
পুরান ঢাকার চিকেন তেহারি কেবল একটি খাবার নয়, এটি একটি ঐতিহ্য, একটি সংস্কৃতি। এর প্রতিটি দানা চাল আর মাংসের টুকরোতে মিশে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা রন্ধনশিল্পের নির্যাস। এই রেসিপি অনুসরণ করে আপনিও ঘরে বসেই এই অসাধারণ স্বাদের জাদু অনুভব করতে পারবেন। একবার রান্না করে দেখুন, দেখবেন আপনার পরিবারের সবার মুখে লেগে থাকবে এর স্মৃতি।
