গরুর নিহারি বা পায়া রান্নার সহজ রেসিপি

 



গরুর নিহারি বা পায়া রান্নার সহজ রেসিপি



গরুর নিহারি বা পায়া রান্নার সহজ রেসিপি


গরুর নিহারি বা পায়া, নাম শুনলেই জিভে জল আসে এমন একটি খাবার। মসলার সুগন্ধে ভরপুর, গরম গরম এই খাবারটি রুটি, পরোটা বা নানের সাথে খাওয়ার মজাই আলাদা। এটি কেবল একটি খাবার নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে মুঘল আমলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। ধীর গতিতে দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা এই খাবারটির স্বাদ অতুলনীয়। চলুন, আজ জেনে নেওয়া যাক গরুর নিহারি বা পায়া রান্নার সহজ রেসিপি, এর পেছনের ইতিহাস, জনপ্রিয়তা এবং আনুষঙ্গিক নানা তথ্য।


উৎপত্তি ও ইতিহাস

নিহারির উৎপত্তি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা আওয়াধের (বর্তমান লখনউ) রাজকীয় রান্নাঘরে।আরবি 'নাহার' শব্দ থেকে 'নিহারি' নামটি এসেছে, যার অর্থ 'সকাল'। মুঘল নবাবরা সাধারণত ফজরের নামাজের পর সকালের নাস্তা হিসেবে এটি খেতেন। প্রাথমিকভাবে এটি শ্রমিক শ্রেণীর জন্য একটি ভারী এবং উচ্চ-শক্তিদায়ক খাবার হিসেবে তৈরি করা হতো, বিশেষ করে শীতকালে সকালে খালি পেটে খাওয়ার জন্য। পরবর্তীতে এর অতুলনীয় স্বাদের কারণে এটি নবাবদের খাবার টেবিলেও জায়গা করে নেয় এবং রাজকীয় খাবারের একটি অংশে পরিণত হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর, উত্তর ভারত থেকে উর্দুভাষী মুসলমানরা পাকিস্তানের করাচি এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় চলে আসার সময় এই রেসিপিটিও সঙ্গে নিয়ে আসেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় এটি তৈরি ও বিক্রি শুরু হয়।


জনপ্রিয়তা

ঐতিহ্যবাহী এই খাবারটি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মানুষের কাছে নিহারি একটি পুরনো এবং জনপ্রিয় খাবার। বাংলাদেশে শীতকালে এবং কোরবানির ঈদের সময় গরুর পায়া খাওয়ার প্রচলন সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে রাস্তার পাশের ছোট ছোট দোকানেও গরম গরম নিহারি বিক্রি করতে দেখা যায়। এর অনন্য স্বাদ এবং ঝোলের জন্য এটি সকলের কাছেই খুব প্রিয় একটি খাবার।


রান্নার সময়

নিহারি রান্নার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটিকে দীর্ঘ সময় ধরে ধীর আঁচে রান্না করা হয়।

সাধারণ হাঁড়িতে: ২থেকে ৩ ঘণ্টা। 

প্রেসার কুকারে: ১ থেকে দেড় ঘণ্টা।

যত বেশি সময় ধরে রান্না করা হয়, হাড় থেকে নির্যাস বেরিয়ে এসে ঝোল তত বেশি সুস্বাদু ও ঘন হয়।



উপকরণ

গরুর পায়া: ১ কেজি ( টুকরো করে কাটা)

পেঁয়াজ কুচি: ১ কাপ

আদা বাটা: ২ টেবিল চামচ

রসুন বাটা: ২ টেবিল চামচ

হলুদ গুঁড়া: ১ চা চামচ

মরিচ গুঁড়া: ২ চা চামচ 

ধনিয়া গুঁড়া: ১ টেবিল চামচ

জিরা গুঁড়া: ১ চা চামচ

গরম মসলা গুঁড়া: ১ চা চামচ

আস্ত গরম মসলা: (এলাচ ৩-৪টি, দারুচিনি ২-৩ টুকরো, লবঙ্গ ৪-৫টি)

তেজপাতা: ২টি

তেল: ১/৪ কাপ

লবণ: স্বাদমতো

ময়দা বা আটা: ২ টেবিল চামচ (পানিতে গুলে নেওয়া)

পানি: পরিমাণমতো

বাগার/ফোড়নের জন্য:

ঘি বা তেল: ২ টেবিল চামচ

পেঁয়াজ কুচি: আধা কাপ

রসুন কুচি: ১ টেবিল চামচ

শুকনা মরিচ: ২-৩টি


প্রস্তুত প্রণালী

১. প্রস্তুতি: প্রথমে গরুর পায়াগুলো ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে পানি ঝরিয়ে নিন।


২. মসলা কষানো: একটি বড় হাঁড়িতে বা প্রেসার কুকারে তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। এরপর আদা বাটা, রসুন বাটা ও সামান্য পানি দিয়ে কষিয়ে নিন।


৩. পায়া রান্না: এবার হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, জিরা গুঁড়া, আস্ত গরম মসলা, তেজপাতা ও লবণ দিয়ে মসলা ভালোভাবে কষিয়ে নিন। মসলার ওপরে তেল ভেসে উঠলে গরুর পায়াগুলো দিয়ে আরও ৭-৮ মিনিট কষাতে হবে।


৪. সিদ্ধ করা: কষানো হয়ে গেলে পরিমাণমতো গরম পানি দিন, যাতে পায়াগুলো পুরোপুরি ডুবে যায়। প্রেসার কুকারে রান্না করলে ঢাকনা বন্ধ করে দিন এবং মাঝারি আঁচে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা রান্না করুন। সাধারণ হাঁড়িতে রান্না করলে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে অল্প আঁচে ৪-৬ ঘণ্টা বা পায়া সম্পূর্ণ সিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন।


৫. ঝোল ঘন করা: পায়া ভালোভাবে সিদ্ধ হয়ে গেলে, previamente পানিতে গুলে রাখা ময়দা বা আটার মিশ্রণটি অল্প অল্প করে ঝোলের সাথে মেশান এবং নাড়তে থাকুন যাতে দলা না ধরে যায়। মিশ্রণটি ঝোলকে ঘন করতে সাহায্য করবে। এরপর আরও ৩০-৪০ মিনিট মৃদু আঁচে রান্না করুন। 


৬. বাগার/ফোড়ন দেওয়া: অন্য একটি প্যানে ঘি বা তেল গরম করে পেঁয়াজ ও রসুন কুচি সোনালি করে ভেজে নিন। সবশেষে শুকনা মরিচ দিয়ে ফোড়ন তৈরি করে সেটি রান্না করা নিহারির ওপর ঢেলে দিন। সবশেষে গরম মসলা গুঁড়া ছড়িয়ে দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে ৫ মিনিট দমে রাখুন।


পুষ্টিগুণ

গরুর পায়া বা নিহারি কেবল সুস্বাদুই নয়, এটি বেশ পুষ্টিকরও।

প্রোটিনের উৎস: এটি উচ্চমানের প্রোটিনের একটি চমৎকার উৎস, যা শরীরের টিস্যু মেরামত ও পেশি গঠনে সাহায্য করে।

কোলাজেন ও জিলেটিন: হাড়ের মজ্জা থেকে কোলাজেন ও জিলেটিন পাওয়া যায়, যা হাড়, জয়েন্ট ও ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

খনিজ উপাদান: এতে আয়রন, জিংক এবং ভিটামিন বি১২ এর মতো প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট থাকে।

শক্তি: এটি একটি উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবার, যা শরীরে শক্তি যোগায়, বিশেষ করে শীতকালে শরীরকে উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে।

তবে, এতে ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকায় উচ্চ কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের রোগীদের পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।

টিপস

নিহারির আসল স্বাদ পেতে এটি সারারাত বা অন্তত ৬-৮ ঘণ্টা অল্প আঁচে রান্না করুন।

ঝোল বেশি ঘন বা পাতলা হয়ে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী গরম পানি বা ময়দার মিশ্রণ যোগ করতে পারেন।

রান্নার শেষে লেবুর রস যোগ করলে স্বাদ আরও বেড়ে যায়।

কিছু রেস্তোরাঁয় প্রতিদিনের বেঁচে যাওয়া নিহারির ঝোল (যাকে 'তার' বলা হয়) পরের দিনের রান্নার জন্য ব্যবহার করা হয়, যা স্বাদকে আরও অনন্য করে তোলে।

পরিবেশন

গরম গরম নিহারি একটি বড় বাটিতে ঢেলে উপরে আদা কুচি, ধনিয়া পাতা কুচি, কাঁচা মরিচ কুচি এবং লেবুর টুকরো দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন। এটি সাধারণত নান রুটি, পরোটা, তন্দুরি রুটি বা চালের রুটির সাথে খাওয়া হয়।

প্রশ্ন ও উত্তর 

প্রশ্ন: নিহারি নামের অর্থ কী?
উত্তর: 'নিহারি' শব্দটি আরবি 'নাহার' থেকে এসেছে, যার অর্থ সকাল। এটি মূলত সকালে খাওয়া হতো বলে এমন নামকরণ করা হয়েছে।[1]

প্রশ্ন: নিহারি রান্না করতে কত সময় লাগে?

উত্তর: ঐতিহ্যগতভাবে নিহারি ধীর গতিতে রান্না করা হয়, যাতে প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে। তবে প্রেসার কুকার ব্যবহার করলে সময় কমিয়ে আনা সম্ভব।[3]

প্রশ্ন: নিহারি খেলে কি শরীরে ক্যালসিয়াম বাড়ে?
উত্তর: একটি প্রচলিত ধারণা থাকলেও, গরুর অস্থিমজ্জায় ক্যালসিয়ামের পরিমাণ খুব কম থাকে (প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ১৭ মিলিগ্রাম)। তাই নিহারি ক্যালসিয়ামের খুব ভালো উৎস নয়। তবে এটি কোলাজেন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ

প্রশ্ন: নিহারি কি প্রতিদিন খাওয়া স্বাস্থ্যকর?

উত্তর: নিহারি একটি উচ্চ ক্যালোরি ও চর্বিযুক্ত খাবার। তাই এটি প্রতিদিনের খাবার তালিকায় না রেখে মাঝে মাঝে খাওয়া ভালো, বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা আছে তাদের জন্য।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url