চকলেট পাটিসাপটা পিঠা রেসিপি

 


চকলেট পাটিসাপটা পিঠা রেসিপি




চকলেট পাটিসাপটা পিঠা রেসিপি 



পিঠা মানেই বাঙালির ঐতিহ্য, উৎসব আর ভালোবাসার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর যদি সেই পিঠা হয় পাটিসাপটা, তাহলে তো কথাই নেই! শীতের সকালে বা বিকেলের আড্ডায় গরম গরম পাটিসাপটা পিঠা যেন এক টুকরো স্বর্গ। কিন্তু কেমন হয় যদি সেই ঐতিহ্যবাহী পাটিসাপটা পিঠার সাথে মিশে যায় আধুনিকতার ছোঁয়া, বিশেষ করে চকলেটের মোহনীয় স্বাদ? হ্যাঁ, আজ আমরা এমনই এক ব্যতিক্রমী এবং সুস্বাদু রেসিপি নিয়ে আলোচনা করব – চকলেট পাটিসাপটা পিঠা। এই রেসিপিটি শুধু আপনার রসনাকেই তৃপ্ত করবে না, বরং আপনার পিঠা বানানোর অভিজ্ঞতাকেও এক নতুন মাত্রা দেবে।


উৎপত্তি ও ইতিহাস:
পাটিসাপটা পিঠা বাঙালির এক অত্যন্ত প্রাচীন ও জনপ্রিয় পিঠা। এর উৎপত্তি ঠিক কবে বা কোথায় হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে ধারণা করা হয়, এটি গ্রামীণ বাংলার ঘরে ঘরেই এর জন্ম। 'পাটি' শব্দের অর্থ হলো বিছানো বা ছড়ানো, আর 'সাপটা' এসেছে 'সাপটানো' থেকে, যার মানে হলো মুড়িয়ে নেওয়া। অর্থাৎ, যে পিঠা তাওয়াতে বিছিয়ে পাতলা রুটির মতো তৈরি করে মুড়িয়ে নেওয়া হয়, সেটাই পাটিসাপটা।

ঐতিহ্যগতভাবে, পাটিসাপটা পিঠা চালের গুঁড়ো, দুধ, গুড় বা চিনি এবং নারকেলের পুর দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি সাধারণত শীতকালে নতুন ধানের চাল উঠলে তৈরি করা হতো এবং বিভিন্ন লোক উৎসবে এর প্রচলন ছিল। সময়ের সাথে সাথে এর উপকরণ ও তৈরির ধরনে ভিন্নতা এলেও, এর মৌলিক স্বাদ ও ঐতিহ্য আজও অমলিন। চকলেট পাটিসাপটা পিঠা সেই ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার এক সুস্বাদু সংমিশ্রণ।


জনপ্রিয়তা:
পাটিসাপটা পিঠার জনপ্রিয়তা বাঙালির ঘরে ঘরে। এটি শুধু গ্রামেই নয়, শহরগুলোতেও সমান জনপ্রিয়। বিভিন্ন পিঠা মেলা, পারিবারিক উৎসব, কিংবা অতিথি আপ্যায়নে পাটিসাপটা পিঠা এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আর চকলেট পাটিসাপটা পিঠা, এর অনন্য স্বাদ এবং অভিনবত্বের কারণে খুব দ্রুতই তরুণ প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। চকলেট প্রেমীদের কাছে এটি এক নতুন স্বাদের আবিষ্কার।


রান্নার সময়:

প্রস্তুতির সময়: ৩০ মিনিট

রান্নার সময়: ৪৫-৫০ মিনিট

মোট সময়: ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট - ১ ঘন্টা ২০ মিনিট

উপকরণ:

পিঠার গোলা তৈরির জন্য:

চালের গুঁড়ো: ১ কাপ (সিদ্ধ চালের গুঁড়ো হলে ভালো হয়)

ময়দা: ১/২ কাপ

কোকো পাউডার: ১/৪ কাপ (ভালো মানের)

চিনি: ১/৪ কাপ (স্বাদমতো কম বা বেশি করা যেতে পারে)

লবণ: ১/২ চা চামচ

তরল দুধ: ২ কাপ (ঠান্ডা)

তেল: ১ টেবিল চামচ (সাদা তেল)

পানি: প্রয়োজনমতো (গোলা ঘন মনে হলে মেশাতে হবে)

চকলেটের পুর তৈরির জন্য:

নারকেল কোরা: ১ কাপ

কন্ডেন্সড মিল্ক: ১/২ কাপ

গুঁড়ো দুধ: ১/৪ কাপ

কোকো পাউডার: ২ টেবিল চামচ

ডার্ক চকলেট চিপস বা ছোট করে কাটা চকলেট: ১/৪ কাপ (ঐচ্ছিক, তবে স্বাদ বাড়ায়)

এলাচ গুঁড়ো: ১/২ চা চামচ (ঐচ্ছিক, সুঘ্রাণের জন্য)

ঘি বা মাখন: ১ চা চামচ

অন্যান্য:

তেল বা ঘি: পিঠা ভাজার জন্য

প্রস্তুত প্রণালী:

১. পিঠার গোলা তৈরি:

একটি বড় পাত্রে চালের গুঁড়ো, ময়দা, কোকো পাউডার, চিনি এবং লবণ একসঙ্গে মিশিয়ে নিন।

এবার অল্প অল্প করে তরল দুধ মেশাতে থাকুন এবং একটি হ্যান্ড বিটার বা চামচ দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে নিন, যাতে কোনো দলা না থাকে।

গোলাটি যেন খুব বেশি ঘন বা খুব বেশি পাতলা না হয়। একটি মসৃণ, মাঝারি ঘনত্বের গোলা তৈরি করুন। প্রয়োজনে সামান্য পানি যোগ করতে পারেন।

সবশেষে, তেলের মিশ্রণটি যোগ করুন এবং আরও একবার ভালো করে ফেটিয়ে নিন।

গোলাটি ৩০ মিনিটের জন্য ঢেকে রেখে দিন। এতে চালের গুঁড়ো ভালোভাবে ভিজে সেট হবে এবং পিঠা নরম হবে।


২. চকলেটের পুর তৈরি:

একটি নন-স্টিক প্যানে ঘি বা মাখন গরম করে নিন।

কোরা নারকেল দিয়ে হালকা ভেজে নিন।

এবার কন্ডেন্সড মিল্ক এবং গুঁড়ো দুধ দিয়ে ভালো করে নাড়তে থাকুন।

মিডিয়াম আঁচে নারকেলের মিশ্রণটি ঘন হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন।

যখন মিশ্রণটি প্যানের গা ছেড়ে আসতে শুরু করবে, তখন কোকো পাউডার এবং এলাচ গুঁড়ো (যদি ব্যবহার করেন) মিশিয়ে দিন।

সবশেষে, ডার্ক চকলেট চিপস বা কাটা চকলেট মিশিয়ে আরও কিছুক্ষণ রান্না করুন, যতক্ষণ না চকলেট গলে পুরের সাথে মিশে যায়।

পুর তৈরি হয়ে গেলে চুলা থেকে নামিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। ঠান্ডা হলে পুর আরও কিছুটা ঘন হবে।


৩. পাটিসাপটা পিঠা তৈরি:

একটি নন-স্টিক তাওয়া বা প্যান মিডিয়াম আঁচে গরম করে নিন।

সামান্য তেল বা ঘি ব্রাশ করে নিন (খুব বেশি তেল যেন না হয়)।

একটি ছোট গোল চামচ বা মগের সাহায্যে ১/৪ কাপ পরিমাণ পিঠার গোলা প্যানের মাঝখানে ঢেলে দিন এবং চামচের পেছন দিয়ে দ্রুত গোল করে পাতলা রুটির মতো ছড়িয়ে দিন।

মিডিয়াম আঁচে পিঠাটি ২-৩ মিনিট রান্না করুন, যতক্ষণ না এর উপরের দিকটা শুকনো মনে হয় এবং কিনারাগুলো প্যান থেকে উঠে আসতে শুরু করে।

যখন পিঠার উপরের দিকটা প্রায় শুকনো হয়ে আসবে, তখন পিঠার একপাশে ২-৩ চামচ চকলেটের পুর লম্বা করে বিছিয়ে দিন।

সাবধানে পিঠাটিকে ভাঁজ করে রোল করে নিন। spatula ব্যবহার করে রোল করতে পারেন।

রোল করা পিঠাটি প্যানে আরও কিছুক্ষণ হালকা ভেজে সোনালী করে নিন।

এভাবে একে একে সবগুলো পাটিসাপটা পিঠা তৈরি করে নিন।

পুষ্টি গুণ (আনুমানিক, প্রতি পরিবেশনে):
চকলেট পাটিসাপটা পিঠা স্বাদের দিক থেকে যেমন চমৎকার, তেমনি এর কিছু পুষ্টি গুণও রয়েছে।

ক্যালোরি: প্রায় ২৫০-৩০০ ক্যালোরি

কার্বোহাইড্রেট: ৩০-৪০ গ্রাম

প্রোটিন: ৫-৭ গ্রাম

ফ্যাট: ১০-১৫ গ্রাম

ফাইবার: ২-৩ গ্রাম
(এই মানগুলো উপকরণের পরিমাণ এবং প্রস্তুত প্রণালীর উপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হতে পারে।)

টিপস:

গোলা তৈরি: গোলা তৈরির সময় খেয়াল রাখবেন যেন কোনো দলা না থাকে। দলা থাকলে পিঠা মসৃণ হবে না। প্রয়োজনে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নিতে পারেন।

গোলা বিশ্রাম: গোলা অন্তত ৩০ মিনিট বিশ্রাম দিতে ভুলবেন না। এতে চালের গুঁড়ো ভালোভাবে ভিজে পিঠা নরম ও মসৃণ হবে।

প্যানের তাপমাত্রা: পিঠা ভাজার সময় প্যান খুব বেশি গরম বা ঠান্ডা হলে পিঠা ভালো হবে না। মিডিয়াম আঁচে রেখে পিঠা তৈরি করুন।

পুর: পুর যেন খুব বেশি নরম না হয়, তাহলে রোল করতে সমস্যা হবে। ঠান্ডা হওয়ার পর পুর কিছুটা শক্ত হয়, তাই সেই হিসাব রেখে রান্না করুন।

নন-স্টিক প্যান: নন-স্টিক প্যান ব্যবহার করলে পিঠা তুলতে সুবিধা হয় এবং তেল কম লাগে।

চকলেটের গুণগত মান: ভালো মানের কোকো পাউডার ও চকলেট ব্যবহার করলে পিঠার স্বাদ অনেক ভালো হবে।

সাজানো: পরিবেশনের সময় উপরে সামান্য কোকো পাউডার ছিটিয়ে বা চকলেট সস দিয়ে সাজিয়ে দিতে পারেন।

পরিবেশন:
চকলেট পাটিসাপটা পিঠা গরম গরম পরিবেশন করাই সবচেয়ে ভালো। শীতের সন্ধ্যায় এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে এই পিঠার জুড়ি মেলা ভার। এছাড়াও অতিথি আপ্যায়নে, জন্মদিনের পার্টিতে বা যেকোনো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে এটি পরিবেশন করা যেতে পারে। চাইলে উপরে সামান্য চকলেটের সস বা আইসিং সুগার দিয়ে সাজিয়ে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন।


প্রশ্ন উত্তর 

প্রশ্ন ১: চালের গুঁড়োর পরিবর্তে অন্য কিছু ব্যবহার করা যাবে কি?

উত্তর: ঐতিহ্যগতভাবে চালের গুঁড়ো ব্যবহার করা হয়। তবে আপনি চাইলে চালের গুঁড়োর সাথে আটা বা সুজি মিশিয়েও ব্যবহার করতে পারেন, এতে পিঠার টেক্সচারে সামান্য ভিন্নতা আসবে।


প্রশ্ন ২: পুর তৈরির সময় কন্ডেন্সড মিল্ক না থাকলে কী ব্যবহার করব?


উত্তর: কন্ডেন্সড মিল্কের পরিবর্তে দুধ ঘন করে চিনি মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। তবে কন্ডেন্সড মিল্ক ব্যবহার করলে স্বাদ ও টেক্সচার বেশি ভালো হয়।


প্রশ্ন ৩: পিঠা প্যানে লেগে গেলে কী করব?


উত্তর: পিঠা প্যানে লেগে গেলে প্যানটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে আবার সামান্য তেল বা ঘি ব্রাশ করে নিন। প্যানের তাপমাত্রা সঠিক আছে কিনা, তাও পরীক্ষা করে দেখুন।


প্রশ্ন ৪: এই পিঠা কতদিন সংরক্ষণ করা যায়?
উত্তর: ফ্রিজে একটি এয়ারটাইট কন্টেইনারে ২-৩ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। পরিবেশনের আগে হালকা গরম করে নিলে ভালো লাগবে।


প্রশ্ন ৫: ডিম ব্যবহার করা যাবে কি?


উত্তর: এই রেসিপিতে ডিম ব্যবহার করা হয়নি। তবে আপনি চাইলে গোলায় একটি ডিম ফেটিয়ে দিতে পারেন, এতে পিঠা আরও নরম ও ফুলকো হবে।

উপসংহার:
চকলেট পাটিসাপটা পিঠা একটি সাধারণ পাটিসাপটা পিঠার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় এবং সুস্বাদু। এটি একই সাথে বাঙালির ঐতিহ্য এবং আধুনিক রন্ধনশিল্পের একটি দারুণ উদাহরণ। এই রেসিপিটি অনুসরণ করে আপনিও ঘরে বসেই তৈরি করতে পারবেন এই অসাধারণ পিঠা এবং মুগ্ধ করতে পারবেন পরিবার ও বন্ধুদের। এই পিঠা শুধু আপনার স্বাদের চাহিদা পূরণ করবে না, বরং আপনার পিঠা তৈরির দক্ষতাকেও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। তাহলে আর দেরি কেন? আজই তৈরি করে ফেলুন এই মজাদার চকলেট পাটিসাপটা
পিঠা!

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url