মজাদার মেরাং কুকিজ রেসিপি


মজাদার মেরাং কুকিজ রেসিপি




মজাদার মেরাং কুকিজ রেসিপি 


 মেরাং কুকিজ হলো এক প্রকার হালকা, মচমচে এবং মিষ্টি কুকি, যা ডিমের সাদা অংশ ও চিনি দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি দেখতে যতটা আকর্ষণীয়, খেতেও ততটাই সুস্বাদু। মুখের ভেতর দিলে যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়, রেখে যায় এক দারুণ মিষ্টি স্বাদ। আজকের রেসিপিতে আমরা মজাদার মেরাং কুকিজ তৈরির বিস্তারিত প্রক্রিয়া জানবো, যা ঘরে বসেই তৈরি করা সম্ভব।


মেরাং কুকিজের উৎপত্তি ও ইতিহাস 

মেরাংয়ের সঠিক উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। তবে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাটি হলো, এটি সুইজারল্যান্ডের মেয়ারিংগেন নামক একটি শহরে আবিষ্কৃত হয়। ১৭২০ সালের দিকে গ্যাসপারিনি নামের এক ইতালীয় শেফ এটি প্রথম তৈরি করেন। এরপর ফরাসি এবং ইতালীয় রন্ধনশিল্পে মেরাং একটি জনপ্রিয় উপকরণ হয়ে ওঠে। ফরাসি রানী মেরি অ্যান্টোয়ানেট মেরাংয়ের একজন বড় ভক্ত ছিলেন এবং তিনিই এর প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মেরাং ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন রূপে তৈরি হতে থাকে। কুকিজ, পাইয়ের টপিং, কেকের সাজসজ্জা—সবখানেই মেরাংয়ের ব্যবহার দেখা যায়। এর হালকা গঠন এবং মিষ্টি স্বাদ একে বিশ্বজুড়ে একটি প্রিয় ডেজার্টে পরিণত করেছে।


জনপ্রিয়তা ও প্রকারভেদ 

মেরাং কুকিজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়, বিশেষ করে যারা গ্লুটেন-মুক্ত ডেজার্ট পছন্দ করেন তাদের কাছে এটি খুবই প্রিয়। এর প্রধান কারণ হলো, এতে ময়দা ব্যবহার করা হয় না। বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে এটি তৈরি করা হয় এবং এর সহজলভ্য উপকরণ একে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তুলেছে।


মেরাংয়ের প্রধানত তিন প্রকারভেদ রয়েছে:

১. ফরাসি মেরাং : এটি সবচেয়ে সহজ মেরাং। ডিমের সাদা অংশ বিট করে ফোম তৈরি করা হয় এবং ধীরে ধীরে চিনি যোগ করে শক্ত ও উজ্জ্বল মেরাং তৈরি করা হয়।


২. সুইস মেরাং : ডিমের সাদা অংশ ও চিনি একসঙ্গে ডাবল বয়লারে গরম করা হয় যতক্ষণ না চিনি গলে যায়, তারপর ঠাণ্ডা করে বিট করা হয়। এটি ফরাসি মেরাংয়ের চেয়ে বেশি স্থিতিশীল।


৩. ইতালীয় মেরাং : এটি সবচেয়ে স্থিতিশীল মেরাং। ফুটন্ত চিনির সিরা ডিমের সাদা অংশের ফোমের মধ্যে ধীরে ধীরে যোগ করে বিট করা হয়। এটি বেকিংয়ের জন্য আদর্শ।

আজ আমরা ফরাসি মেরাং পদ্ধতিতে কুকিজ তৈরি করবো, যা বাড়িতে তৈরি করা সবচেয়ে সহজ।


রান্নার সময় 

প্রস্তুতি সময়: ১৫-২০ মিনিট

বেকিং সময়: ৬০-৯০ মিনিট (ওভেনের তাপমাত্রা এবং কুকিজের আকারের উপর নির্ভর করে)

ঠাণ্ডা হওয়ার সময়: কমপক্ষে ৩০ মিনিট


উপকরণ 

মজাদার মেরাং কুকিজ তৈরির জন্য খুব বেশি উপকরণের প্রয়োজন হয় না। মাত্র কয়েকটি সহজলভ্য উপাদান দিয়ে এটি তৈরি করা যায়:

ডিমের সাদা অংশ: ২ টি (বড় ডিমের)

কাস্টার সুগার বা মিহি চিনি: ১৫০ গ্রাম

ভ্যানিলা এক্সট্র্যাক্ট: ১/২ চা চামচ (ঐচ্ছিক, তবে স্বাদ বাড়াতে সাহায্য করে)

এক চিমটি লবণ


প্রস্তুত প্রণালী 

ধাপে ধাপে এই রেসিপি অনুসরণ করে সহজেই মেরাং কুকিজ তৈরি করতে পারবেন:

১. উপকরণ প্রস্তুত:
ওভেন ১৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রায় প্রিহিট করুন।
একটি বেকিং ট্রেতে পার্চমেন্ট পেপার বিছিয়ে রাখুন।
ডিম থেকে সাবধানে সাদা অংশ আলাদা করুন। খেয়াল রাখবেন যেন ডিমের কুসুমের এক ফোঁটাও সাদা অংশে মিশে না যায়, কারণ এতে মেরাং ঠিকমতো ফোম হবে না।
যে পাত্রে ডিম বিট করবেন, সেটি এবং বিটারের কাঁটাগুলো পরিষ্কার ও শুকনো হতে হবে। সামান্যতম তেল বা চর্বি মেরাং তৈরিতে বাধা দিতে পারে।


২. ডিমের সাদা অংশ বিট করা:
একটি বড় বাটিতে ডিমের সাদা অংশ এবং এক চিমটি লবণ নিন। একটি ইলেকট্রিক মিক্সার বা হ্যান্ড বিটার ব্যবহার করে মিডিয়াম স্পিডে বিট করা শুরু করুন। যখন ডিমের সাদা অংশ হালকা ফোম হতে শুরু করবে এবং নরম চূড়া তৈরি হবে, তখন ধীরে ধীরে চিনি যোগ করা শুরু করুন। একবারে সব চিনি না দিয়ে অল্প অল্প করে যোগ করুন।


৩. চিনি যোগ করা:
এক চামচ করে চিনি যোগ করতে থাকুন এবং বিট করতে থাকুন। প্রতিবার চিনি যোগ করার পর ভালোভাবে মিশে যাওয়া পর্যন্ত বিট করুন।
যতক্ষণ না সব চিনি মিশে যায় এবং মেরাং ঘন, উজ্জ্বল ও শক্ত চূড়া ধারণ করে, ততক্ষণ বিট করতে থাকুন।
যখন মিক্সারের কাঁটা তুলবেন, তখন মেরাংয়ের চূড়াগুলো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং চকচকে দেখাবে।
এই পর্যায়ে ভ্যানিলা এক্সট্র্যাক্ট যোগ করে হালকাভাবে মিশিয়ে নিন।


৪. কুকিজ তৈরি: মেরাং একটি পাইপিং ব্যাগে ভরে নিন (আপনার পছন্দের কোনো নজল ব্যবহার করতে পারেন, যেমন স্টার নজল)। পার্চমেন্ট পেপার বিছানো বেকিং ট্রেতে ছোট ছোট কুকিজের আকার দিন। আপনি চাইলে চামচ দিয়েও কুকিজের আকার দিতে পারেন, তবে পাইপিং ব্যাগ ব্যবহার করলে দেখতে সুন্দর হয়।
কুকিজগুলো এমনভাবে সাজান যেন একটির সঙ্গে আরেকটির লেগে না যায়।


৫. বেকিং: প্রিহিট করা ওভেনে বেকিং ট্রেটি রাখুন। তাপমাত্রা ১৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রাখুন।
* ৬০ থেকে ৯০ মিনিট ধরে বেক করুন। মেরাং কুকিজ বেক হয় না, বরং ধীরে ধীরে শুকিয়ে মচমচে হয়। তাই কম তাপমাত্রায় দীর্ঘক্ষণ ধরে বেক করা প্রয়োজন।
কুকিজগুলো যখন হাত দিয়ে স্পর্শ করলে শুকনো এবং সহজেই ট্রে থেকে উঠে আসবে, তখন বুঝতে হবে হয়ে গেছে।


৬. ঠাণ্ডা করা:
বেকিং হয়ে গেলে ওভেন বন্ধ করে দিন।
তবে সঙ্গে সঙ্গে কুকিজ বের করবেন না। ওভেনের দরজা সামান্য খোলা রেখে কুকিজগুলো ওভেনের ভেতরেই সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হতে দিন। এতে কুকিজের মচমচে ভাব বজায় থাকবে এবং ভেতরের অংশ ঠিকভাবে সেট হবে। সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হয়ে গেলে ওভেন থেকে বের করে এয়ারটাইট কন্টেইনারে সংরক্ষণ করুন।


পুষ্টি গুণ 

মেরাং কুকিজের প্রধান উপাদান হলো ডিমের সাদা অংশ ও চিনি। এতে ফ্যাট এবং ক্যালোরি তুলনামূলকভাবে কম থাকে, বিশেষ করে অন্যান্য কুকিজের তুলনায়।

ক্যালোরি: একটি মাঝারি মেরাং কুকিজের ক্যালোরি প্রায় ৩০-৫০ হয়ে থাকে।

প্রোটিন: ডিমের সাদা অংশ থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়।

ফ্যাট: প্রায় শূন্য।

কার্বোহাইড্রেট: চিনি থেকে আসে।

এটি গ্লুটেন-মুক্ত হওয়ায় যাদের গ্লুটেন অ্যালার্জি বা সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার ডেজার্ট।


টিপস 

ডিমের সাদা অংশ: ডিমের সাদা অংশ অবশ্যই কক্ষ তাপমাত্রায় থাকতে হবে। ঠাণ্ডা ডিমের সাদা অংশ ভালোভাবে ফোম হয় না।

পরিষ্কার পাত্র: নিশ্চিত করুন যে বাটি এবং বিটারের কাঁটাগুলো সম্পূর্ণ পরিষ্কার এবং তেল বা চর্বি মুক্ত। সামান্যতম চর্বি মেরাং ফোম হওয়া আটকে দিতে পারে।

ধীরে ধীরে চিনি যোগ: চিনি একবারে না দিয়ে ধীরে ধীরে যোগ করুন। এতে চিনি ভালোভাবে মিশে যাবে এবং মেরাং আরও স্থিতিশীল হবে।

ওভেনের তাপমাত্রা: মেরাং কুকিজ কম তাপমাত্রায় দীর্ঘক্ষণ ধরে শুকিয়ে নেওয়া হয়, বেক করা হয় না। তাই সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ঠাণ্ডা হওয়া: বেকিংয়ের পর ওভেনের ভেতরেই কুকিজ ঠাণ্ডা হতে দিন। এতে কুকিজ ভেঙে যাবে না এবং মচমচে থাকবে।

সংরক্ষণ: মেরাং কুকিজ আর্দ্রতা শোষণ করে খুব দ্রুত নরম হয়ে যায়। তাই একটি এয়ারটাইট কন্টেইনারে সংরক্ষণ করুন। এতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত মচমচে থাকবে।

রঙ যোগ: আপনি চাইলে বিট করার সময় ফুড কালার যোগ করতে পারেন যাতে কুকিজ আরও আকর্ষণীয় দেখায়।

ফ্লেভার: ভ্যানিলা এক্সট্র্যাক্টের পরিবর্তে লেবুর রস, পুদিনা এক্সট্র্যাক্ট বা কোকো পাউডার যোগ করে বিভিন্ন ফ্লেভারের মেরাং তৈরি করতে পারেন।


প্রশ্ন উত্তর 

১. আমার মেরাং কেন শক্ত চূড়া তৈরি হচ্ছে না?


 কারণ হতে পারে ডিমের সাদা অংশের সঙ্গে কুসুমের অংশ মিশে গেছে।
* বাটি বা বিটারের কাঁটা পরিষ্কার ছিল না, চর্বি বা তেল লেগেছিল।
* ডিমের সাদা অংশ কক্ষ তাপমাত্রায় ছিল না।
* যথেষ্ট সময় ধরে বিট করা হয়নি।

২. মেরাং কুকিজ নরম হয়ে যায় কেন?


 আর্দ্রতা শোষণ করার কারণে মেরাং কুকিজ নরম হয়ে যায়। বেকিংয়ের পর ওভেনে সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা না করা বা এয়ারটাইট কন্টেইনারে সংরক্ষণ না করার কারণে এমনটা হতে পারে।

৩. কাস্টার সুগারের পরিবর্তে সাধারণ চিনি ব্যবহার করা যাবে?


হ্যাঁ, যাবে। তবে সাধারণ চিনি ব্যবহার করলে মেরাংয়ে চিনির দানাগুলো সম্পূর্ণ গলতে কিছুটা বেশি সময় লাগে। কাস্টার সুগার মিহি হওয়ায় সহজে গলে যায় এবং মেরাংয়ের টেক্সচার মসৃণ হয়। আপনি চাইলে সাধারণ চিনিকে ব্লেন্ডারে গুঁড়ো করে কাস্টার সুগার তৈরি করতে পারেন।

৪. মেরাং কুকিজ কতদিন ভালো থাকে?


 একটি এয়ারটাইট কন্টেইনারে সংরক্ষণ করলে মেরাং কুকিজ প্রায় ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত মচমচে ও সুস্বাদু থাকে।


৫. মেরাং কুকিজে কি লেবুর রস যোগ করা যায়?



হ্যাঁ, ডিমের সাদা অংশ বিট করার সময় সামান্য লেবুর রস (১/২ চা চামচ) যোগ করলে মেরাং আরও স্থিতিশীল হয় এবং ভালোভাবে ফোম হতে সাহায্য করে। এটি মেরাংয়ের সাদা রঙ ধরে রাখতেও সাহায্য করে।

এই বিস্তারিত রেসিপি অনুসরণ করে আপনিও ঘরে বসেই তৈরি করতে পারবেন মজাদার এবং আকর্ষণীয় মেরাং কুকিজ। এই হালকা, মিষ্টি এবং মচমচে কুকিজ আপনার পরিবার ও বন্ধুদের মন জয় করবে নিশ্চিত

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url