সহজ উপায়ে মুরালি রেসিপি:

সহজ উপায়ে মুরালি রেসিপি:









সহজ উপায়ে মুরালি রেসিপি: 

মুরালি, বাঙালির এক অত্যন্ত প্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। এর খাস্তা আবরণ আর মিষ্টি স্বাদ মন কেড়ে নেয় সহজেই। ছোট থেকে বড় সকলের কাছেই মুরালি এক নস্টালজিক খাবার। চা বা কফির আড্ডায়, বিকেলের নাস্তায় কিংবা উৎসব-পার্বণে মুরালি তার নিজস্ব স্থান করে নিয়েছে। আজ আমরা সহজ উপায়ে মুরালি তৈরির একটি বিস্তারিত রেসিপি জানবো, যা আপনাকে নিখুঁত ও সুস্বাদু মুরালি বানাতে সাহায্য করবে।

মুরালির উৎপত্তি, ইতিহাস ও জনপ্রিয়তা

মুরালি ঠিক কবে বা কোথায় প্রথম তৈরি হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে ধারণা করা হয়, এটি ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত। মিষ্টি তৈরির কৌশল ও কারুকার্য মুঘল দরবারে বিশেষ গুরুত্ব পেত। সেই সময় থেকেই বিভিন্ন ধরনের মিষ্টির প্রচলন শুরু হয়, যার মধ্যে মুরালি অন্যতম। সময়ের সাথে সাথে এটি বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় এবং নিজস্ব এক পরিচিতি লাভ করে।

মুরালির জনপ্রিয়তা আজও অমলিন। বিশেষ করে গ্রাম বাংলার মেলা ও উৎসবে মুরালির কদর অপরিসীম। বিভিন্ন দোকানে, রাস্তার পাশে ছোট ছোট ফেরিওয়ালাদের কাছেও মুরালি পাওয়া যায়। এর খাস্তা টেক্সচার এবং মিষ্টির হালকা আস্তরণ এটিকে অন্যান্য মিষ্টি থেকে আলাদা করে তোলে। এটি এমন একটি খাবার যা শুধু স্বাদই দেয় না, বরং অনেক স্মৃতিও ফিরিয়ে আনে।

উপকরণ 

মুরালি তৈরির জন্য খুব বেশি উপকরণের প্রয়োজন হয় না। হাতের কাছে থাকা সাধারণ কিছু জিনিস দিয়েই এই সুস্বাদু মিষ্টি তৈরি করা যায়।

ময়দার খামিরের জন্য:

ময়দা: ২ কাপ

সুজি: ২ চামচ 

তেল/ঘি: ১/৪ কাপ 

লবণ: ১/২ চা চামচ

জল: পরিমাণ মতো 

চিনির সিরার জন্য:

চিনি: ১ কাপ

জল: ১/২ কাপ

এলাচ গুঁড়ো: ১/৪ চা চামচ 

ভাজার জন্য:

সাদা তেল: ভাজার জন্য পরিমাণ মতো

প্রস্তুত প্রণালী 

মুরালি তৈরি করা খুব কঠিন কিছু নয়। কয়েকটি ধাপে ধাপে কাজ করলেই সহজেই তৈরি হয়ে যাবে আপনার প্রিয় মুরালি।

১. ময়দার খামির তৈরি:

প্রথমে একটি বড় পাত্রে ময়দা, সুজি এবং লবণ নিন।

এবার তেল বা ঘি দিয়ে ময়দা ভালোভাবে ময়ান দিন। হাত দিয়ে ঘষে ঘষে ময়ান দিন, যাতে ময়দার প্রতিটি কণার সাথে তেল বা ঘি মিশে যায়। ময়ান সঠিক হয়েছে কিনা তা বোঝার জন্য, ময়দা মুঠো করে ধরলে যদি দলা বাঁধে এবং হাত দিয়ে চাপ দিলে ভেঙে যায়, তাহলে বুঝবেন ময়ান ঠিক আছে।

অল্প অল্প করে জল দিয়ে শক্ত খামির তৈরি করুন। লুচি বা পরোটার খামিরের চেয়ে কিছুটা শক্ত হবে।

খামির তৈরি হয়ে গেলে ভেজা কাপড় দিয়ে ঢেকে ১৫-২০ মিনিটের জন্য রেখে দিন। এতে খামির নরম হবে এবং কাজ করতে সুবিধা হবে।

২. মুরালির আকার দেওয়া:

১৫-২০ মিনিট পর খামির থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে নিন।

প্রতিটি লেচি রুটির মতো করে বেলে নিন। রুটি খুব বেশি পাতলা হবে না, আবার খুব বেশি মোটাও হবে না। মাঝারি পুরুত্বের রুটি তৈরি করুন।

এবার ছুরি বা পিৎজা কাটার দিয়ে রুটি থেকে লম্বা লম্বা ফালি কেটে নিন।

এরপর সেই ফালিগুলো থেকে চৌকো, বরফি বা আপনার পছন্দ মতো যেকোনো আকার কেটে নিন। মুরালির মাঝখানে ছোট ছিদ্র করতে চাইলে, মাঝ বরাবর সামান্য কেটে নিন। এতে মুরালি দেখতে আকর্ষণীয় হয় এবং ভাজার সময় ভেতরে ভালোভাবে ভাজা হয়।

৩. ভাজা:

একটি কড়াইতে সাদা তেল গরম করতে দিন। তেল মাঝারি আঁচে গরম করুন। খুব বেশি গরম হলে মুরালি বাইরে থেকে দ্রুত পুড়ে যাবে এবং ভেতর কাঁচা থাকবে। আবার খুব বেশি ঠাণ্ডা হলে তেল শুষে নেবে।

তেল গরম হলে মাঝারি আঁচে মুরালিগুলো ডুবো তেলে ভাজুন। একবারে বেশি মুরালি দেবেন না, তাহলে তাপমাত্রা কমে যাবে।

সোনালী বাদামী হওয়া পর্যন্ত উল্টে পাল্টে ভাজুন। ভাজতে প্রায় ৫-৭ মিনিট সময় লাগবে।

ভাজা হয়ে গেলে তেল ঝরিয়ে একটি কিচেন টিস্যুর উপর তুলে রাখুন।

৪. চিনির সিরা তৈরি:

অন্য একটি কড়াইতে চিনি এবং জল নিন। মাঝারি আঁচে গরম করতে থাকুন।

চিনি গলে গিয়ে সিরা ঘন হয়ে এলে এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে দিন।

সিরা একটি তারের মতো আঠালো না হওয়া পর্যন্ত ফুটিয়ে নিন। সিরা খুব বেশি ঘন হলে মুরালির গায়ে ভালোভাবে লাগবে না, আবার খুব বেশি পাতলা হলে খাস্তা হবে না। দুই তারের সিরা হলে ভালো হয়।

৫. সিরায় মেশানো:

গরম চিনির সিরায় ভাজা মুরালিগুলো দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।

অনবরত নাড়তে থাকুন, যতক্ষণ না চিনির সিরা মুরালির গায়ে শুকিয়ে যায় এবং একটি সাদা আবরণ তৈরি হয়।

এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত করতে হবে, কারণ সিরা ঠাণ্ডা হয়ে গেলে মুরালির গায়ে ভালোভাবে লাগবে না।

৬. ঠাণ্ডা করা ও পরিবেশন:

চিনির সিরায় মাখানো মুরালিগুলো একটি থালায় ছড়িয়ে দিন এবং সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হতে দিন।

ঠাণ্ডা হয়ে গেলে মুরালিগুলো আরও খাস্তা হয়ে যাবে।

এরপর বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করুন এবং চা বা কফির সাথে পরিবেশন করুন।

রান্নার সময় 

মুরালি তৈরি করতে মোট আনুমানিক ৪০-৫০ মিনিট সময় লাগে।

খামির তৈরি ও বিশ্রাম: ১৫-২০ মিনিট

আকার দেওয়া: ১০-১৫ মিনিট

ভাজা: ১০-১২ মিনিট

চিনির সিরা তৈরি ও মেশানো: ৫-১০ মিনিট

টিপস 

নিখুঁত ও সুস্বাদু মুরালি তৈরির জন্য কিছু টিপস:

ময়ানের গুরুত্ব: ময়দা ময়ান দেওয়ার সময় তেল বা ঘি সঠিক পরিমাণে ব্যবহার করুন। এটি মুরালিকে খাস্তা করতে সাহায্য করে।

খামিরের ঘনত্ব: খামির লুচির চেয়ে কিছুটা শক্ত হতে হবে। নরম খামির দিয়ে ভাজলে মুরালি খাস্তা হবে না।

রুটির পুরুত্ব: রুটি খুব বেশি পাতলা বা মোটা করবেন না। মাঝারি পুরুত্বের রুটি থেকে কাটা মুরালি ভালো ভাজা হয়।

ভাজার কৌশল: মুরালি মাঝারি আঁচে ভাজুন। দ্রুত ভাজতে গেলে ভেতর কাঁচা থাকবে। সোনালী বাদামী হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে ভাজুন।

চিনির সিরা: সিরা তৈরির সময় এর ঘনত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুই তারের সিরা হলে মুরালির গায়ে ভালোভাবে লেগে একটি সুন্দর আবরণ তৈরি হবে।

সিরা মেশানো: সিরায় মুরালি মেশানোর পর দ্রুত নাড়তে থাকুন, যাতে সিরা সব মুরালির গায়ে সমানভাবে লেগে যায় এবং দলা না পাকিয়ে যায়।

পরিবেশন 

মুরালি একটি versatile মিষ্টি। এটি বিভিন্নভাবে পরিবেশন করা যায়:

বিকেলের নাস্তা: চা বা কফির সাথে মুরালি একটি চমৎকার সঙ্গী।

উৎসব-পার্বণ: ঈদ, পূজা, বা যেকোনো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে এটি অতিথিদের জন্য একটি মজাদার আপ্যায়ন হতে পারে।

শিশুদের টিফিন: বাচ্চারাও এই মিষ্টি খেতে ভালোবাসে। তাদের টিফিনেও মুরালি দিতে পারেন।

উপহার: হাতে তৈরি মুরালি সুন্দর প্যাকেজিং করে প্রিয়জনদের উপহারও দিতে পারেন।

পুষ্টি গুণ 

মুরালি মূলত ময়দা, চিনি এবং তেলে তৈরি হয়। তাই এটি একটি ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার।

ক্যালরি: উচ্চ।

কার্বোহাইড্রেট: উচ্চ (চিনি ও ময়দার কারণে)।

ফ্যাট: উচ্চ (তেলে ভাজার কারণে)।

প্রোটিন: নগণ্য।

ফাইবার: নগণ্য।

যারা স্বাস্থ্য সচেতন, তাদের জন্য পরিমিত পরিমাণে মুরালি গ্রহণ করাই ভালো।









উত্তর: চিনির সিরা বেশি ঘন হয়ে গেলে সামান্য গরম জল মিশিয়ে হালকা গরম করে আবার সঠিক ঘনত্বে আনতে পারেন।

প্রশ্ন উত্তর 

প্রশ্ন: মুরালি কেন খাস্তা হয় না?

উত্তর: মুরালি খাস্তা না হওয়ার কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, ময়দায় সঠিক ময়ান না দেওয়া। দ্বিতীয়ত, খামির খুব নরম হলে। তৃতীয়ত, খুব বেশি তাপে ভাজলে মুরালি বাইরে থেকে পুড়ে যায় কিন্তু ভেতর থেকে নরম থাকে।

প্রশ্ন: মুরালি কতদিন সংরক্ষণ করা যায়?

উত্তর: বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে মুরালি অনায়াসে ১৫-২০ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। তবে আর্দ্রতা থেকে দূরে রাখতে হবে।

প্রশ্ন: মুরালি তৈরিতে সুজি ব্যবহার কি বাধ্যতামূলক?

উত্তর: না, সুজি ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। তবে সুজি ব্যবহার করলে মুরালি আরও বেশি খাস্তা ও মুচমুচে হয়।

প্রশ্ন: চিনির সিরা বেশি ঘন হয়ে গেলে কি করব?


প্রশ্ন: মুরালির মাঝখানে ছিদ্র না করলে কি কোনো সমস্যা হবে?

উত্তর: না, কোনো সমস্যা হবে না। মাঝখানে ছিদ্র করা কেবল দেখতে আকর্ষণীয় করার জন্য। এটি স্বাদে কোনো পরিবর্তন আনবে না।

শেষ কথা

মুরালি বাঙালির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর ঐতিহ্যবাহী স্বাদ আর সহজ প্রস্তুত প্রণালী এটিকে চিরকালই জনপ্রিয় করে রাখবে। এই রেসিপি অনুসরণ করে আপনিও ঘরে বসেই তৈরি করতে পারবেন দোকানের মতো সুস্বাদু ও খাস্তা মুরালি। পরিবারের সাথে উপভোগ করুন এই মজাদার মিষ্টি!


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url