চিকেন মোমো তৈরির সহজ রেসিপি

 


চিকেন মোমো তৈরির সহজ রেসিপি







চিকেন মোমো তৈরির সহজ রেসিপি 

বাঙালির রান্নাঘরে এখন বিশ্বায়ন। চাউমিন, পাস্তা, পিৎজ্জার পর যে খাবারটি আমাদের রসনাকে তৃপ্ত করে চলেছে, সেটি হলো মোমো। হিমালয়ের কোলের এই পদটি আজ আমাদের বিকালের নাস্তা বা বন্ধুদের আড্ডার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। নরম তুলতুলে ময়দার আবরণের ভেতরে রসালো চিকেনের পুর, সাথে ঝাল ঝাল চাটনি – ভাবতেই জিভে জল চলে আসে। চলুন, আজ আমরা এই জনপ্রিয় খাবারটির আদ্যোপান্ত জেনে নিই এবং শিখে নিই বাড়িতেই সহজে চিকেন মোমো তৈরির পারফেক্ট রেসিপি।


উৎপত্তি ও ইতিহাস

মোমোর জন্মস্থান নিয়ে খাদ্যরসিকদের মধ্যে নানা মত প্রচলিত থাকলেও, এর শেকড় তিব্বতে প্রোথিত বলেই অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন। ‘মোমো’ শব্দটি 'মগমগ' নামক তিব্বতি শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ 'মাংসে ভরা ভাপা ময়দার পুডিং'। প্রথাগতভাবে চমরী গাইয়ের মাংস দিয়ে এই পদটি তৈরি করা হতো। তিব্বত থেকে নেপালের কাঠমান্ডু উপত্যকার নেওয়ারি ব্যবসায়ীদের হাত ধরে মোমো নেপালে প্রবেশ করে এবং সেখানে এটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

অনেকের মতে, চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নেপালেই মোমোর জন্ম।পঞ্চদশ শতকে একজন নেপালি রাজকুমারীর সাথে তিব্বতের রাজার বিবাহসূত্রে এই খাবারটি তিব্বতে পৌঁছায়। পরবর্তীকালে, ১৯৫৯ সালের তিব্বতি বিদ্রোহের পর বিপুল সংখ্যক তিব্বতি ভারতে আশ্রয় নিলে, তাদের হাত ধরেই মোমো ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে দার্জিলিং, সিকিম, লাদাখ এবং দিল্লিতে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে এসে চমরী গাইয়ের মাংসের পরিবর্তে মুরগি ও মোষের মাংস এবং নিরামিষ পুরের ব্যবহার শুরু হয়, যা এর জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।


জনপ্রিয়তার শিখরে মোমো

পাহাড়ের কোল থেকে নেমে এসে মোমো আজ ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এর আবেদন আকাশছোঁয়া। ভাজাভুজির তুলনায় স্বাস্থ্যকর এবং সাধ্যের মধ্যে দাম হওয়ায় মোমো খুব সহজেই সকলের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। স্কুল-কলেজের ক্যান্টিন থেকে শুরু করে বড় বড় রেস্তোরাঁ, সর্বত্রই মোমোর জয়জয়কার। চিকেন মোমো, ভেজিটেবল মোমো, পনির মোমো থেকে শুরু করে আধুনিক ফিউশন, যেমন তন্দুরি মোমো বা আফগানি মোমো – এর বৈচিত্র্যও এর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

রান্নার সময়

প্রস্তুতির সময়: ৩০-৪০ মিনিট

রান্নার সময়: ১০-১৫ মিনিট

মোট সময়: ৪৫-৫৫ মিনিট

উপকরণ

ময়দার আবরণের জন্য:

ময়দা: ২ কাপ

লবণ: ১/২ চা চামচ

তেল: ১ টেবিল চামচ

পানি :প্রয়োজনমতো 

চিকেনের পুরের জন্য:

চিকেন কিমা: ২৫০ গ্রাম

পেঁয়াজ কুচি: ১টি

আদা বাটা/কুচি: ১ চা চামচ

রসুন বাটা/কুচি: ১ চা চামচ

কাঁচামরিচ কুচি: ২-৩টি

সয়া সস: ১ টেবিল চামচ

গোলমরিচ গুঁড়ো: ১/২ চা চামচ

ধনে পাতা কুচি: ২ টেবিল চামচ

পেঁয়াজ পাতা কুচি: ২ টেবিল চামচ

মাখন বা তেল: ১ টেবিল চামচ

লবণ: স্বাদমতো


প্রস্তুত প্রণালী


ময়দার আবরণ তৈরি

একটি বড় পাত্রে ময়দা ও লবণ ভালো করে মিশিয়ে নিন।

এরপর এতে তেল দিয়ে ময়ান দিন।

অল্প অল্প করে জল মিশিয়ে একটি নরম ও মসৃণ খামির তৈরি করুন। খেয়াল রাখবেন খামির যেন খুব বেশি নরম বা শক্ত না হয়ে যায়।

খামিরটি একটি ভেজা কাপড় দিয়ে ঢেকে ৩০ মিনিটের জন্য রেখে দিন।


চিকেনের পুর তৈরি

একটি প্যানে মাখন বা তেল গরম করুন।

এতে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে হালকা সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।

এরপর আদা ও রসুন কুচি দিয়ে কয়েক সেকেন্ড নাড়ুন।

এবার চিকেন কিমা দিয়ে দিন এবং নাড়তে থাকুন যতক্ষণ না চিকেনের রঙ পরিবর্তন হয়।

চিকেন সেদ্ধ হয়ে এলে এতে সয়া সস, গোলমরিচ গুঁড়ো এবং স্বাদমতো লবণ দিন।

সবকিছু ভালো করে মিশিয়ে ২-৩ মিনিট রান্না করুন।

সবশেষে কাঁচামরিচ, ধনে পাতা ও পেঁয়াজ পাতা কুচি দিয়ে নেড়ে নামিয়ে নিন। পুরটি ঠান্ডা হতে দিন।


মোমো তৈরি ও ভাপানো

ময়দার খামির থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে নিন।

প্রতিটি লেচি পাতলা করে লুচির আকারে বেলে নিন। রুটির মাঝখানটা সামান্য মোটা এবং ধারগুলো পাতলা হলে ভালো হয়।

এবার প্রতিটি রুটির মাঝখানে পরিমাণ মতো চিকেনের পুর দিন।

এরপর রুটির ধারগুলো একসাথে ধরে এনে আপনার পছন্দমতো আকারে মুড়ে দিন। খেয়াল রাখবেন যেন মোমোর মুখ ভালোভাবে বন্ধ হয়।

একটি স্টিমারে বা হাঁড়িতে জল গরম করতে দিন।

স্টিমারের পাত্রে সামান্য তেল মাখিয়ে নিন যাতে মোমো আটকে না যায়।

এবার মোমোগুলো স্টিমারে সামান্য ফাঁক রেখে সাজিয়ে দিন।

পাত্রটি ঢেকে দিয়ে ১০-১২ মিনিট বা মোমোর উপরের আবরণটি স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত ভাপ দিন।

পুষ্টিগুণ

ঘরে তৈরি চিকেন মোমো একটি স্বাস্থ্যকর খাবার হতে পারে।

প্রোটিন: চিকেন থাকার কারণে এটি প্রোটিনের একটি ভালো উৎস, যা পেশি গঠনে সহায়তা করে।

কার্বোহাইড্রেট: ময়দার আবরণ থেকে কার্বোহাইড্রেট পাওয়া যায়, যা শরীরে শক্তি জোগায়।

ভিটামিন ও খনিজ: পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ধনে পাতার মতো উপকরণ থাকায় এতে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়।

তবে, দোকানের কেনা মোমোতে ব্যবহৃত উপকরণ এবং রান্নার পরিবেশের উপর এর স্বাস্থ্যকর দিকটি নির্ভর করে। ময়দার অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি মোমো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

টিপস

মোমোর খামির খুব বেশি নরম করবেন না, তাহলে বেলার সময় অসুবিধা হবে।

পুর যেন একদম শুকনো হয়, ভেজা পুরের কারণে মোমো ফেটে যেতে পারে।

স্টিম করার সময় মোমোগুলোর মধ্যে কিছুটা ফাঁক রাখুন, কারণ ভাপে এগুলো কিছুটা ফুলে ওঠে।

স্টিমার না থাকলে, একটি বড় হাঁড়িতে জল ফুটিয়ে তার উপর একটি ঝাঁঝরি বা চালনি রেখে, তাতে তেল মাখিয়ে মোমো ভাপাতে পারেন।

মোমো সংরক্ষণ করতে চাইলে, কাঁচা অবস্থাতেই একটি এয়ারটাইট বক্সে ভরে ডিপ ফ্রিজে রাখতে পারেন।

পরিবেশন

গরম গরম চিকেন মোমো সাধারণত ঝাল টমেটোর চাটনি বা সসের সাথে পরিবেশন করা হয়। এর সাথে গরম চিকেন স্যুপও পরিবেশন করতে পারেন। ধোঁয়া ওঠা মোমোর সাথে ঝাল চাটনি আর গরম স্যুপ – এই সমন্বয়টি এক কথায় অসাধারণ।


প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন: মোমোর পুর কি কাঁচা ব্যবহার করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, অনেক রেসিপিতে চিকেন কিমার সাথে সমস্ত উপকরণ মেখে কাঁচা পুরই ব্যবহার করা হয় এবং ভাপানোর সময় তা সেদ্ধ হয়ে যায়।


প্রশ্ন: মোমো কি ভেজে খাওয়া যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, ভাপানো মোমোকে তেলে ভেজে "ফ্রায়েড মোমো" বা প্যানে সামান্য তেল দিয়ে ভেজে "প্যান ফ্রায়েড মোমো" বা "কোথে মোমো" হিসেবেও খাওয়া যায়।


প্রশ্ন: মোমোর চাটনি কীভাবে বানাবো?

উত্তর: টমেটো, শুকনো লঙ্কা, রসুন, আদা এবং সামান্য লবণ একসাথে সেদ্ধ করে ঠান্ডা করে বেটে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মোমোর ঝাল চাটনি।


প্রশ্ন: মোমো কথার অর্থ কী?

উত্তর: 'মোমো' শব্দটির একটি অর্থ হলো 'মাংসে ভরা ভাপা ময়দার পুডিং বিশেষ'।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url